❓প্রশ্ন: লিখিতভাবে বিবাহের প্রস্তাব দান ও প্রস্তাব গ্রহণ করলে কি বিবাহ সহীহ হবে?
✍️উত্তর:……بسم الله الرحمن الرحيم……
★ ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ের মূল রুকন বা ভিত্তি হলো— ইজাব (প্রস্তাব), কবুল (গ্রহণ) ও সাক্ষী। সাধারণত বিবাহ সহীহ হওয়ার জন্য একই মাজলিসে সাক্ষীর সামনে সরাসরি মুখে উচ্চারণের মাধ্যমে এই ইজাব-কবুল সম্পন্ন করা জরুরী। তাই বর কনে যদি একই মাজলিসে উপস্থিত থেকে সাক্ষীর সামনে একজনে লিখিতভাবে প্রস্তাব দেয়, আরেকজনে লিখিতভাবে প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং কেউ তা পাঠ করে সাক্ষীদের শুনায় বা সাক্ষীরা পাঠ করে নেয় তাহলে বিবাহ সহীহ হবে না।
কেননা বিবাহের চুক্তিতে ‘লফজ’ বা মৌখিক উচ্চারণ রুকন হিসেবে গণ্য। একই মজলিসে উপস্থিত থাকা অবস্থায় এই রুকন বর্জন করে লিখলে তা বিয়ে হিসেবে গণ্য হয় না। তাছাড়া অন্য কেউ পড়ে শোনানো মানে হলো সেই ব্যক্তিটি কেবল তথ্য দিচ্ছে, কিন্তু ইজাব বা কবুল সরাসরি বর বা কনের মুখ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে না। অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে চিঠির পাঠক ‘বার্তাবাহক’ হিসেবে গণ্য হয়, কিন্তু উপস্থিত ক্ষেত্রে এমনটা করার সুযোগ নেই।
★তবে যদি এক পক্ষ মজলিসে উপস্থিত থাকে ও অপর পক্ষ দূরে থেকে লিখিতভাবে (চিঠি বা বার্তার মাধ্যমে) বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় তাহলে জায়েজ হবে। তবে এক্ষেত্রে বিয়ে সহীহ হওয়ার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত রয়েছে। শর্তটি হলো, যখন প্রস্তাবপ্রাপক (যাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে) চিঠি বা বার্তাটি পাবেন, তখন তাকে দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে সেটি পড়ে শোনাতে হবে এবং সাক্ষীদের সামনেই বলতে হবে যে, “আমি এই প্রস্তাব কবুল করলাম।” সাক্ষীদের সামনে প্রস্তাবটি পাঠ না করে বা তাদের না জানিয়ে শুধু নিজে নিজে কবুল বললে বিয়ে সম্পন্ন হবে না।
কেননা যখন প্রস্তাবদাতা চিঠি পাঠায় এবং প্রস্তাব গ্রহণকারী সেই মজলিসে উপস্থিত থেকে তা কবুল করে, তখন গ্রহনকারীর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে একটি ‘শরয়ি মজলিস’ গঠিত হয়। প্রেরকের চিঠি সেখানে তার প্রতিনিধিত্ব করে।
★ কিন্তু বর ও কনে উভয়েই যদি বিবাহের মাজলিস থেকে দূরে থাকে এবং বিবাহের মাজলিসে উপস্থিত লোকদের কাছে একজনে লিখিতভাবে প্রস্তাব পাঠালো ও আরেকজনে লিখিতভাবে প্রস্তাব গ্রহণমূলক বক্তব্য পাঠালো। এরপর কেউ তা সাক্ষীদেরকে পড়ে শুনালো বা সাক্ষীরা পড়ে নিলো তাহলে বিবাহ সহীহ হবে না।
কেননা যখন বর ও কনে উভয়েই অনুপস্থিত থাকে এবং কেবল তাদের লেখা কাগজ কোনো তৃতীয় স্থানে পৌঁছায়, তখন সেখানে কোনো বাস্তব শরয়ি মজলিস গঠিত হয় না। কারণ আকদ বা চুক্তির অন্তত একটি পক্ষকে সেখানে উপস্থিত থাকতে হয়।
ফাতাওয়া শামিতে বলা হয়েছে:
”وبإسماعهم الكتاب… قد سمعوا الشطرين”
অর্থাৎ: সাক্ষীরা উভয় পক্ষ শুনতে পেল।
এখানে ‘শুনতে পাওয়া’ বলতে কেবল তথ্য জানা বোঝায় না, বরং সাক্ষীদের সামনে সরাসরি দুই পক্ষের (বা এক পক্ষ ও অপর পক্ষের বার্তার) মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হতে দেখা বোঝায়। যখন বর ও কনে দুজনেই অনুপস্থিত, তখন সাক্ষীরা কার সাথে কার চুক্তি দেখছে? সেখানে তো কোনো পক্ষই নেই। একজনের লেখা কাগজ আর আরেকজনের লেখা কাগজ দিয়ে চুক্তি হয় না, বরং একজন ব্যক্তির সাথে অন্য ব্যক্তির চুক্তি হতে হয়।
যদি বর ও কনে উভয়ই মজলিস থেকে দূরে থাকে, তবে তাদের বিয়ে সহীহ করার শরয়ি পদ্ধতি হলো ‘ওকালত’ বা প্রতিনিধি নিয়োগ। বর তার পক্ষ থেকে একজনকে উকিল (প্রতিনিধি) নিয়োগ করবে। সেই উকিল বিবাহের মজলিসে উপস্থিত হয়ে সাক্ষীদের সামনে বলবে, “আমি বরের উকিল হিসেবে কনের কাছে প্রস্তাব দিচ্ছি।” তখন কনে (বা তার উকিল) যদি তা কবুল করে, তবে বিয়ে সহীহ হবে।
⚠️গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
বর্তমান যুগে ডিজিটাল মাধ্যম (যেমন: মেসেজ, ইমেইল বা হোয়াটসঅ্যাপ) ব্যবহার করেও লিখিত প্রস্তাব পাঠানো সম্ভব। তবে এক্ষেত্রেও নিম্নের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি:
১. সাক্ষী: অন্তত দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ (অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী) সাক্ষীর সামনে প্রস্তাবটি পড়ে শোনাতে হবে এবং কবুল বলতে হবে।
২. নিশ্চয়তা: প্রেরকের পরিচয় সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে। যদি জালিয়াতি বা অন্য কেউ নাম ব্যবহার করে প্রস্তাব পাঠানোর আশঙ্কা থাকে, তবে বিয়ে সহীহ হবে না।
৩. স্পষ্টতা: লেখায় বিয়ের প্রস্তাব এবং মোহরের বিষয়গুলো সুস্পষ্ট হতে হবে।
সারকথা: যদি প্রস্তাবপ্রাপক চিঠি বা বার্তাটি পাওয়ার পর দুইজন সাক্ষীর সামনে তা পড়ে শোনান এবং কবুল করেন, তবে লিখিতভাবে করা এই বিয়ে শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ বা সহীহ হবে। তবে ফেতনা ও জটিলতা এড়াতে সরাসরি উপস্থিত হয়ে বা বিশ্বস্ত প্রতিনিধির (উকিল) মাধ্যমে মৌখিকভাবে ইজাব-কবুল করাই উত্তম।
📚 দলীল:
কুরআনুল কারীমের মূলনীতি:
পবিত্র কুরআনে বিবাহকে ‘মিছাকান গালিজা’ বা অত্যন্ত দৃঢ় ও শক্তিশালী অঙ্গীকার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ”তারা (নারীরা) তোমাদের নিকট থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার (মিছাকান গালিজা) গ্রহণ করেছে।” -(সূরা নিসা: ২১)
দলীলের ব্যাখ্যা: মুফাসসিরীনদের মতে, এই ‘দৃঢ় অঙ্গীকার’ বা চুক্তি সম্পন্ন হয় সুস্পষ্ট শব্দ ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে সরাসরি ইজাব-কবুলের মাধ্যমে। চুক্তির পূর্ণতার জন্য মজলিস ও উচ্চারণের গুরুত্ব এখান থেকেই প্রতীয়মান হয়।
মৌখিক উচ্চারণ ও ঘোষণা সংক্রান্ত হাদীস:
বিবাহ যে কেবল মনের ইচ্ছা বা গোপন কোনো বিষয় নয়, বরং এটি শব্দ ও ঘোষণার মাধ্যমে হতে হয়, তার প্রমাণ এই হাদীসটি:
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ أَعْلِنُوا هَذَا النِّكَاحَ وَاجْعَلُوهُ فِي الْمَسَاجِدِ وَاضْرِبُوا عَلَيْهِ بِالدُّفُوفِ ”
অর্থ: হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “তোমরা এই বিবাহের ঘোষণা দাও, এটি মসজিদে সম্পন্ন করো এবং এতে দফ (এক প্রকার বাদ্যযন্ত্র) বাজাও।”
(সুনানে তিরমিযী, হাদীস নম্বর: ১০৮৯)
ব্যাখ্যা: “ঘোষণা দাও” (أعلِنوا) অর্থই হলো শব্দের মাধ্যমে এটি প্রচার করো। লিখে দেওয়া বা মনে রাখা ঘোষণা নয়। ঘোষণা তখনই হয় যখন শব্দ উচ্চারিত হয়।
ইজাব ও কবুলের “বক্তব্য” শোনা সংক্রান্ত হাদীস:
বিবাহ সহীহ হওয়ার জন্য সাক্ষীদের সরাসরি ইজাব ও কবুল শোনা অপরিহার্য, যা মৌখিক উচ্চারণ ছাড়া অসম্ভব:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: “ لاَ نِكَاحَ إِلاَّ بِبَيِّنَةٍ ”
অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, “স্পষ্ট দলীল (সাক্ষী) ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।”
(সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস: ৪০৭৫; সুনানে বায়হাকী: ১৩৭০৩)
ব্যাখ্যা: ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, সাক্ষীকে তখনই ‘ব্যায়্যিনাহ’ (স্পষ্ট সাক্ষী) বলা হয়, যখন সে নিজের কানে ইজাব ও কবুলের শব্দগুলো শুনতে পায়। মৌখিক উচ্চারণ ছাড়া সাক্ষীদের শোনা সম্ভব নয়।
মজলিস এক হওয়া সংক্রান্ত মূলনীতি ও হাদীসের ইশারা:
শরিয়তের দৃষ্টিতে ইজাব ও কবুলের মজলিস এক হওয়া কেন জরুরি, তার ভিত্তি হলো এই নীতি:
”العقد يربط بين الإيجاب والقبول”
(চুক্তি হলো প্রস্তাব ও গ্রহণের মধ্যকার মিলনসূত্র।)
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো বিয়ের চুক্তি বা লেনদেন করতেন, তখন তা এক মজলিসেই সম্পন্ন হতো। হাদীসে এসেছে:
নবী করীম (সা.) জনৈক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, “أَنْكَحْتُكَهَا بِمَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ” (তোমার কাছে থাকা কুরআনের বিনিময়ে আমি তাকে তোমার নিকট বিবাহ দিলাম)। তৎক্ষণাৎ ওই ব্যক্তি তা গ্রহণ করেছিলেন।
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫০৩০)
ব্যাখ্যা: এখানে ‘মজলিস এক হওয়া’ অর্থ হলো— ইজাব (প্রস্তাব) দেওয়ার পর মজলিস শেষ হওয়ার আগেই কবুল করতে হবে। যদি মজলিস বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে আগের প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়
আল্লামা আমীন ইবনে আবেদীন শামী হানাফী (রহ:) লিখেন,
…….فقط. والله اعلم بالصواب …….
🖍️উত্তর লিখনে-
মুফতী রিয়াজুল ইসলাম হানাফী
মাদারীপুরী
👉🏿শরয়ী মাসয়ালার সামাধান জানতে যোগাযোগ করুন –
📱01339868000 (Whatsapp)
💌contact.sunnatibibaho@gmail.com
