“সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, সংসার ধ্বংস হয় রমণীর আগুনে”—বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদটি দাম্পত্য জীবনে নারীর ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে।
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতেও একটি পরিবার গঠিত হয় পারস্পরিক ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও ত্যাগের ওপর। পরিবারকে জান্নাতি শান্তিময় নীড়ে পরিণত করা কিংবা তা জাহান্নামের মতো অশান্তিতে রূপ দেওয়ার পেছনে নারীর মানসিকতা ও আচরণের প্রভাব অপরিসীম।
সুখের ভিত্তি: রমণীর গুণ
একটি পরিবারকে সুশৃঙ্খল ও ভালোবাসাপূর্ণ করার পেছনে নারীর প্রজ্ঞা ও গুণাবলীর ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে কুরআন ও হাদীসে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
শান্তির নীড় ও মানসিক প্রশান্তি: আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি লাভ কর এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” -[সূরা আর-রূম: ২১]।
স্ত্রীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতাই ঘরকে প্রশান্তির স্থানে পরিণত করে।
উৎকৃষ্ট সম্পদ: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “সমগ্র দুনিয়াই সম্পদ, আর দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ হলো নেককার স্ত্রী।” [সহীহ মুসলিম: ১৪৬৭]।
একজন নেককার স্ত্রী কেবল নিজের আমল নয়, বরং পুরো ঘরের পরিবেশকে আল্লাহর আনুগত্যে পরিচালিত করেন।
সহমর্মিতা ও আনুগত্য:
ওহী নাজিলের কঠিনতম সময়ে আম্মাজান খাদিজা (রা.) যেভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মানসিক আশ্রয় ও সাহস জুগিয়েছিলেন, তা একজন গুণবতী নারীর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।
অশান্তির কারণ: রমণীর আগুন
পক্ষান্তরে, যে সংসারে হীনম্মন্যতা, হিংসা, অসন্তোষ ও কুটিলতা প্রবেশ করে, সেখানে জান্নাত সমতুল্য ঘরও অশান্তির আগুনে দগ্ধ হয়।
অকৃতজ্ঞতা ও অহেতুক তুলনা:
অনেক সময় অন্যের সাথে নিজের জীবনের তুলনা বা স্বামীর সামর্থ্যের অতিরিক্ত দাবি করা সংসারের শান্তি বিনষ্ট করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ নারীদের অকৃতজ্ঞতা এড়িয়ে চলার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, “তোমরা স্বামীর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো না।” [সহীহ বুখারী: ২৯]। অল্পে তুষ্ট থাকার মানসিকতা না থাকলে দাম্পত্যে কখনোই সুখ আসে না।
ঝগড়া ও অহংকার:
ঘরে শান্তি বজায় রাখার বদলে অহেতুক কটু কথা, গীবত ও অহংকার পরিবারে অশান্তির আগুন জ্বালায়। যা ধীরে ধীরে সম্পর্কের বন্ধন ছিন্ন করে।
পুরুষের দায়িত্ব ও সহনশীলতা:
প্রবাদে “রমণীর গুণ” বা “আগুন”-এর কথা বলা হলেও ইসলাম একতরফা দায় নারীর ওপর চাপায়নি। পুরুষের দায়িত্বহীনতাও সংসার ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
উত্তম আচরণ:
কুরআনুল কারীমে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, “তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করো।” [সূরা নিসা: ১৯]।
ক্ষমা ও সহনশীলতা:
স্ত্রীর ত্রুটিগুলো বড় করে না দেখে তার গুণগুলোর দিকে তাকানোর নির্দেশ দিয়ে হাদীসে বলা হয়েছে, “কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। তার একটি অভ্যাস অপছন্দ হলে, অন্য একটি অভ্যাস সে পছন্দ করবে।” [সহীহ মুসলিম: ১৪৬৯]।
মোটকথা, সংসার কোনো একতরফা যাত্রা নয়; এটি একটি দ্বিপক্ষীয় ত্যাগ ও বোঝাপড়ার মাধ্যম। নারী যখন প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও শুকরিয়া দিয়ে ঘর সামলায় এবং পুরুষ যখন দায়িত্বশীলতা, ভালোবাসা ও সহনশীলতা দিয়ে স্ত্রীকে আগলে রাখে, তখনই প্রবাদের সেই “রমণীর গুণে” একটি সংসার দুনিয়াতেই জান্নাতের সুবাতাস এনে দেয়।
